স্ট্রোক একটি ব্রেনের
রোগ, যা ব্রেনের রক্তনালী বন্ধ হয়ে বা ফেটে গিয়ে হয় এবং প্রকাশিত লক্ষণ ২৪ ঘন্টার চেয়ে
বেশি বিদ্যমান থাকে। এর ফলে মস্তিষ্কের অভ্যন্তরের কোষগুলো প্রয়োজনীয় অক্সিজেন এবং
পুষ্টি পায় না, ফলে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। অনেকের ধারণা স্ট্রোক হার্টের রোগ, আসলে এটা
ব্রেনের রোগ; তাই কখনোই এটাকে হার্ট স্ট্রোক বলা যাবে না। অধুনা ভবিষ্যতে হার্ট অ্যাটাক
ও ব্রেইন অ্যাটাক নামে এ দুই রোগকে মানুষ চিনবে। মোট স্ট্রোকের ৮৫ ভাগ ক্ষেত্রেই রক্তবাহী
নালী বন্ধ হয়ে হয়, যাকে বলে সেরিব্রাল ইনফারক্ট। বাকি ১৫ ভাগ হয় রক্তনালী ফেটে গিয়ে,
যাকে বলে হেমোরেজিক স্ট্রোক। রক্তবাহী নালী বন্ধ হয় তিনভাবে। প্রথমত, মধ্যম মাপের ব্রেনের
ভিতরের রক্তনালীর গায়ে কোলেস্টেরল জমে আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, ব্রেনের
বাইরের বড় মাপের রক্তনালীর গায়ে কোলেস্টেরল জমে আস্তে আস্তে নালীর পথ কমে যায়। কমতে
কমতে এক পর্যায়ে ৬০ শতাংশের ওপরে গেলে ওখানে রক্তপ্রবাহ কমে গিয়ে রক্ত জমাট বাঁধে।
জমাট রক্ত ছুটে গিয়ে ব্রেনের মধ্যে ঢুকে যায় এবং ছোট বা মধ্যম মাপের রক্তনালীতে ঢুকে
বন্ধ করে দেয়। ব্রেনকলাতে রক্ত না যেতে পারার জন্য ওই অংশটি মারা যায় এবং স্ট্রোক হয়।
তৃতীয়ত, হার্টের গতিতে কোনো সমস্যা বা হার্টের অ্যাটাক হলে ওখানে রক্ত জমে যায়। সেই
জমাট বাঁধা রক্ত হার্ট থেকে মহাধমনি হয়ে ক্যারটিড ধমনিতে ঢুকে পড়ে। সেখান থেকে ব্রেনের
মধ্যে ঢুকে ব্রেনের মধ্যম বা ছোট মানের রক্তবাহী নালী বন্ধ করে এবং স্ট্রোক হয়।
ট্রান্সিয়েন্ট
ইসকেমিক অ্যাটাক
স্ট্রোকের উপসর্গগুলো
২৪ ঘন্টা বা তার কম সময়ে ভালো হয়ে গেলে তাকে ট্রান্সিয়েন্ট ইসকেমিক অ্যাটাক বলা হয়।
এতে রোগীর মস্তিষ্ক স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। কিন্তু এটি স্ট্রোকের জন্য অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক বার্তা। গবেষণায় দেখা যায়, এতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই
কিছু দিনের মধ্যে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়।
স্ট্রোকের ক্ষতিকর
প্রতিক্রিয়া এত বেশি যে, এটার প্রতিরোধ করা জনস্বার্থের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। তবে
প্রাথমিক প্রতিরোধ খুব বেশি কার্যকর নয়।
স্ট্রোকের ঝুঁকি
কমিয়ে শতকরা ৮০ ভাগ স্ট্রোক প্রতিরোধ করা সম্ভব। যদিও স্ট্রোক যে কারো ক্ষেত্রে ঘটতে
পারে, কিন্তু কিছু ঝুঁকি স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে। এ জন্য ব্যক্তিগত ঝুঁকিগুলো
জেনে সেগুলো কমাতে পারলে এবং স্ট্রোক হওয়ার সাথে সাথে তা বুঝে ত্বরিত চিকিৎসকের শরণাপন্ন
হতে পারলে স্ট্রোকের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
নিয়ন্ত্রণযোগ্য
ঝুঁকি
উচ্চ রক্তচাপ
এট্রিয়াল ফিব্রিলেশন
রক্তে চর্বির আধিক্য
এথরোসক্লিরোসিস-শরীরে, মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহের সমস্যা
ক্যারোটিড ধমনির সমস্যা
ডায়াবেটিস
ধূমপান
মদপান
স্থূলতা (ওবেসিটি)
জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবন
অনিয়ন্ত্রণযোগ্য ঝুঁকি
আফ্রিকান-আমেরিকান মহিলা, হার্টে জন্মগত ফোরামেন ওভেল ছিদ্র
ফাইব্রোমাস কুলার ডিসপ্লাসিয়া, যত বেশি বয়স তত বেশি স্ট্রোক, স্ট্রোক পরবর্তী জটিলতা
এবং মৃত্যুহার অধিক বয়সে বেশি, ৪৫ বছরের উর্ধ্বে প্রতি ১০ বছরে স্ট্রোক ঝুঁকি বাড়ে
দ্বিগুণ, ৪০ বছর বয়সে এক লাখে ১০ জন স্ট্রোকে মারা যায়, ৭৫ বছর বয়সে এক লাখে এক হাজার
জন মারা যায়, ডায়াসটোলিক প্রেসার 5mmHg বাড়লে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে ৫০ শতাংশ, মায়োকার্ডিয়াল
ইনফারকশন (হার্ট অ্যাটাক) প্রায় ৭০ শতাংশ স্ট্রোক রোগীদের ক্ষেত্রে দেখা যায় কোনো না
কোনো হার্টের রোগ আছে।
একবার স্ট্রোক হলে পরবর্তীকালে স্ট্রোক প্রতিরোধে ব্যবস্থা
অ্যান্টিপ্লাটিলেট ওষুধ যেমন-এসপিরিন, ক্লপিডগ্রেল সেবন,
স্ট্যাটিন-রক্তে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করে অ্যান্টিকোগ্লুলেন্ট যেমন ওয়ারফেরিন সেবন
(এট্রিয়াল ফিব্রিলেশনে), উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, ক্যারোটিড অ্যান্ড আর্টারেক্টমি
বা এনজিওপ্লাস্টি (ক্যারোটিড ধমনি স্টেনোসিস) হলে কিছু কিছু ঝুঁকি কমিয়ে ৮০ শতাংশ স্ট্রোকের
ঝুঁকি কমানো সম্ভব। ব্যক্তিগত ঝুঁকিগুলো জেনে ও স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা গেলে সাথে সাথে
ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।
স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে ব্যবস্থা
উচ্চ রক্তচাপ হচ্ছে স্ট্রোকের বড় ঝুঁকি, যদি তা ঠিকমতো চিকিৎসা
করে নিয়ন্ত্রণে না রাখা হয়। এজন্য চিকিৎসকের কাছে যেয়ে রক্তচাপ মেপে যথাযথ ব্যবস্থা
নিতে হবে।
এট্রিয়ালফিব্রিলেশন হার্টের অস্বাভাবিক স্পন্দন যা ৫০০ শতাংশ
স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। এতে হার্টে রক্তজমাট বাঁধা ত্বরান্বিত করে, ফলে স্ট্রোক
হতে পারে।
ধূমপান স্ট্রোকের ঝুঁকি দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে রক্তনালীর
দেয়ালে ক্ষত সৃষ্টি করে, এতে ধমনিতে প্রতিবন্ধকতা বৃদ্ধি করে রক্তচাপ বাড়িয়ে হার্টের
কাজকে কঠিন করে দেয়।
কোলেস্টেরল রক্তের ভেতরে চর্বিজাতীয় পদার্থ। এটা খাবারের
মাধ্যমে শরীরে আসে এবং শরীরের ভেতরেও তৈরি হয়। এই কোলেস্টেরল রক্তে বৃদ্ধি হলে ধমনিতে
জমাট বেঁধে রক্তপ্রবাহ বাধা সৃষ্টি করে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
ডায়াবেটিস-চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ ও পথ্য পরিমিত গ্রহণ
করে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা গেলে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
অতিরিক্ত ওজন-শরীরের ওজন বেড়ে গেলে রক্তপ্রবাহে বাধা পড়ে।
নিয়মিত সপ্তাহে পাঁচ দিন কমপক্ষে আধা ঘন্টা ব্যায়াম করলে এবং কম ক্যালরি,
চর্বি, লবণ গ্রহণ না করে ওজন কমানো যায়। তাছাড়া বেশি বেশি ফলমূল ও সবজি খেলেও
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। ওজন কমিয়ে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে কোলেস্টেরল
নিয়ন্ত্রণে এনে স্ট্রোক প্রতিরোধ করা যায়। সূত্র: হেলথ ম্যাগাজিন, নভেম্বর ২০১৩।
No comments:
Post a Comment